সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার বিদ্যুৎ গ্রাহকদের নাভিশ্বাস উঠেছে ‘ভুতুড়ে’ বিদ্যুৎ বিলের যন্ত্রণায়। দিন-রাত ২৪ ঘণ্টার মধ্যে নামমাত্র বিদ্যুৎ সেবা পেলেও মাসের শেষে গ্রাহকদের হাতে ধরিয়ে দেওয়া হচ্ছে আকাশচুম্বী বিল। এই অস্বাভাবিক ও কাল্পনিক বিলের কারণে সাধারণ মানুষের জীবনে নেমে এসেছে চরম ভোগান্তি, আর বিদ্যুৎ অফিসের দায়সারা বক্তব্যে ক্ষোভ বাড়ছে জনমনে।
সরেজমিনে ও ভুক্তভোগীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, উপজেলার বাসিন্দা জিলু মিয়া নামের এক দরিদ্র মানুষ, যিনি একা বসবাস করেন এবং ঘরে কেবল একটি ফ্যান ও দুটি লাইট ব্যবহার করেন। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, আগে প্রতি মাসে তার বিদ্যুৎ বিল ৩০০-৪০০ টাকা আসলেও গত তিন মাসে তার থেকে জোরপূর্বক ৬৩০০ টাকা আদায় করা হয়েছে। বর্তমানে চলতি এক মাসেই তার বিল এসেছে ৪৬৩৫ টাকা। জিলু মিয়ার প্রশ্ন, “দিন-রাত মিলে ১-২ ঘণ্টাও বিদ্যুৎ পাই না, সেখানে এই বিপুল পরিমাণ টাকা বিল আসে কীভাবে এই বিল পরিশোধ করার মতো সামর্থ্য আমার নেই।
একই ধরনের অভিযোগ নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন পেশায় গাড়ি চালক আরেক ভুক্তভোগী। তিনি বলেন, এক মাসে আমার নামে ২২৫৩ টাকা বিল ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এই কাল্পনিক বিলের অভিযোগ নিয়ে অফিসে গেলে কর্মচারীরা অত্যন্ত রূঢ় আচরণ করে। পরে মিটার রিডিং দেখাতে বাধ্য করলে তারা বিল কমিয়ে ৭৭২ টাকা করে দেয়। এভাবে ইচ্ছামতো বিল ধরিয়ে দিয়ে আমাদের নিয়মিত হয়রানি করা হচ্ছে। অফিসে আসা-যাওয়া করতে আমাদের শ্রম ও অর্থ ব্যয় হয়, কাজের দিন নষ্ট হয়। এই বিদ্যুতের ভেলকিবাজি আমাদের জীবনযাত্রা অতিষ্ঠ করে তুলেছে।
এদিকে উপজেলার রমাপতিপুর গ্রাম থেকে হেঁটে বিদ্যুৎ অফিসে আসা এক অসহায় বৃদ্ধা কান্নায় ভেঙে পড়ে বলেন, আমি অসহায় মানুষ। দিনে-রাতে বিদ্যুৎ পাই না বললেই চলে, কখনো ২৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না। যদি বিদ্যুৎ ব্যবহারই না করি, তবে এতো টাকা বিল আসে কীসের? এটা কি বিদ্যুৎ বিল, নাকি আমাদের সাথে ফাজলামি
এসব ভুতুড়ে বিল এবং গ্রাহক হয়রানির বিষয়ে জগন্নাথপুর সাব-জোনাল অফিসের দায়িত্বশীল কর্মকর্তা (এজিএম) ঋষিকেশ বিশ্বাস-এর কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি জনবল সংকট ও দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়াকে অজুহাত হিসেবে দাঁড় করান। তিনি দাবি করেন, কর্মী সংকটের কারণে বৃষ্টি ও কাদার মধ্যে নিয়মিত এলাকায় গিয়ে মিটার রিডিং নেওয়া সম্ভব হয় না। সে কারণেই অনুমানের ওপর বিল করায় কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিল বেশি চলে যাচ্ছে।
বিদ্যুৎ অফিসের এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন ও দায়সারা জবাবে চরম ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী। স্থানীয়দের অভিযোগ, মাঠকর্মীরা মিটার রিডিং নিতে না পারলে অফিসে বসে নিজের ইচ্ছেমতো ইউনিট বসিয়ে দেয়। ভুক্তভোগীরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, কর্মকর্তারা এসি রুমে বসে সাধারণ মানুষের পকেট কাটছেন। আমরা ঠিকমতো বিদ্যুৎ পাই না, জরুরি কাজ করতে পারি না, রাতে শান্তিতে ঘুমাতে পারি না। মানুষের কষ্টের এই দায়ভার কে নেবে? আমরা এর স্থায়ী প্রতিকার চাই।
জগন্নাথপুরের সচেতন মহল ও সাধারণ ভুক্তভোগী গ্রাহকরা অবিলম্বে সুনামগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন, যেন দ্রুত জগন্নাথপুরে বিদ্যুৎ সেবার মান উন্নত করা হয় এবং এই ‘ভুতুড়ে’ বিলের নামে গ্রাহক হয়রানির নৈরাজ্য চিরতরে বন্ধ হয়।