এই ডায়েরিখানি যখন তোমার হাতে তুলে দেব, তখন হয়তো আমার কণ্ঠ স্বাভাবিক থাকবে না। কিছু কিছু কথা আছে—মুখে উচ্চারণ করিবার সময় তারা কণ্ঠে এসে থেমে যায়; কেবল নীরবতার মধ্যেই তাদের সম্পূর্ণ অর্থ প্রকাশ পায়।
এই ডায়েরি কেবল কয়েকটি লেখা নয়। ইহার পাতায় পাতায় আমার জীবনের এমন এক ঋতু জমিয়া আছে, যাহার কথা পৃথিবীর আর কেহ জানে নাই।
তুমি জানো কি?
আমি তোমাকে কখনো দেখিনি—তবু তোমাকে হারানোর বেদনা বহন করেছি।
তুমি জানতেই না—তবু তোমাকে ভালোবাসার সমস্ত নীরব অধিকার আমি আমার হৃদয়ে ধারণ করেছি।
তুমি আমার জীবনের পথে ছিলে না, অথচ আমার জীবনের যে দীর্ঘ শূন্যতা—তার নিঃশব্দ নাম যেন তুমি।
দশটি বছর অল্প সময় নয়।
মানুষ অভিনয় করিতে পারে—কিছুদিন, কিছুক্ষণ; কিন্তু একটি হৃদয় কি দশটি বছর ধরে একই মিথ্যার কাছে মাথা নত করে থাকতে পারে?
আমি পারিনি।
কারণ আমি অভিনয় করিনি।
আমি সত্যিই তোমাকে ভালোবেসেছিলাম।
একদিন যখন জানলাম, তুমিও কোনো এক নির্জন প্রার্থনায় এমন একজন মানুষকে চেয়েছিলে—যে তোমাকে সমস্ত হৃদয় দিয়ে ভালোবাসবে—সেদিন আমার মনে হলো, এতদিনের নীরব প্রতীক্ষা বুঝি সম্পূর্ণ বৃথা যায়নি।
হয়তো আমাদের পথ দুদিকে চলে গিয়েছিল।
হয়তো সময় আমাদের হাত দুটি আলাদা করে দিয়েছিল।
হয়তো ভাগ্যের কোনো অদৃশ্য বিধান আমাদের পাশাপাশি দাঁড়াতে দেয়নি।
কিন্তু সময় অনেক কিছু কেড়ে নিতে পারে—
হৃদয়ের প্রথম সত্যটিকে পারে না।
সে আগুন আজও নিভে যায়নি।
আমি জানি না, ভবিষ্যৎ আমাদের জন্য কী লিখে রেখেছে। জানি না, কোনোদিন আমাদের পথ আবার একই সন্ধ্যার আকাশের নিচে এসে মিলবে কি না।
তবু একটি কথা জানি—
আমি তোমাকে কেবল পাওয়ার আকাঙ্ক্ষায় ভালোবাসিনি।
তোমাকে সম্মান করেছি।
তোমার মর্যাদাকে ভালোবাসার চেয়েও বড় করে দেখেছি।
তুমি আমার কল্পনার কোনো চরিত্র নও; তুমি রক্ত-মাংসের একজন মানুষ—যার আছে স্বপ্ন, সংগ্রাম, ক্লান্তি, অভিমান এবং নিজের মতো করে বেঁচে থাকার অধিকার। সেই মানুষটিকেই আমি ভালোবেসেছি।
আর আমার জীবনের আরেকটি সত্য তোমার কাছে গোপন রাখতে চাই না।
আমার জীবনে দুটি ছোট্ট প্রাণ আছে—
আমার দুই ছেলে।
তারা আমার জীবনের দুটি প্রদীপ।
তাদের মুখের দিকে তাকালে আমি বুঝি, পৃথিবীতে আমার এখনো অনেক পথ চলা বাকি।
তোমাকে ভালোবাসার আগে আমি একজন বাবা।
এই সত্য আমার জীবনের কোনো আড়াল করা অধ্যায় নয়। বরং এটাই আমার জীবনের সবচেয়ে নির্মল সত্যগুলোর একটি।
কারণ ভালোবাসা যদি সত্যিই পবিত্র হয়, তবে তার ভিত্তি মিথ্যার উপর হতে পারে না।
কোনোদিন যদি তুমি এই ডায়েরির শেষ পাতাটি পড়ে নিঃশব্দে ভাবো—
“কেউ একজন আমাকে এত গভীরভাবে ভালোবেসেছিল!”
তবে আমার এই দীর্ঘ লেখা সার্থক হবে।
তোমাকে পাওয়া হয়তো আমার ভাগ্যে লেখা ছিল না।
কিন্তু তোমাকে ভালোবাসার যে অনুভূতি—সেটুকু আমার কাছ থেকে কেউ কোনোদিন কেড়ে নিতে পারবে না।
তুমি আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর অপেক্ষা।
সবচেয়ে দীর্ঘশ্বাসভেজা স্মৃতি।
আর সবচেয়ে আশ্চর্য ফিরে পাওয়া—যাকে হারিয়েও কোনোদিন সম্পূর্ণ হারাতে পারিনি।
জীবনের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়েও যদি তোমার কথা মনে পড়ে, তবে কোনো অভিযোগ থাকবে না।
শুধু মনে হবে—
জীবনের পথে কত মানুষ আসে, কত মানুষ চলে যায়;
কেউ কেউ থাকে না, অথচ তাদের জন্য হৃদয়ের একটি দরজা সারাজীবন খোলা থাকে।
তুমিও তেমনই একজন।
তুমি থাকো কিংবা না থাকো,
আমার প্রার্থনার নীরব আকাশে
তোমার নামটি থেকে যাবে।
আর যদি কোনোদিন এই ডায়েরির পাতাগুলো বন্ধ করে তুমি দূরে চলে যাও, তবে জেনে রেখো—
কোনো এক মানুষ তোমাকে পাওয়ার জন্য নয়,
তোমার ভালো থাকার জন্যও
নীরবে প্রার্থনা করেছিল।